পড়ার সময় ঘুম আসলে করণীয় কী? জানুন সহজ ও কার্যকরী উপায়
সমস্যাটা আসলে কোথায়?
পড়তে বসলেই কেন ঘুম আসে, আর মোবাইল চালালে কেন ঘুম আসে না এই প্রশ্নটা কখনো নিজেকে করেছেন? এর প্রধান কারণ হলো আমাদের মস্তিষ্ক। আমরা যখন পড়ি, তখন আমাদের চোখ এবং মস্তিষ্ককে একই সাথে অনেক বেশি ফোকাস করতে হয়। নতুন তথ্য প্রসেস করতে গিয়ে মস্তিষ্ক খুব দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু মোবাইল স্ক্রল করার সময় আমরা সাধারণত কোনো গভীর চিন্তা করি না, এটি এক ধরনের প্যাসিভ এন্টারটেইনমেন্ট। তাই মস্তিষ্কের ক্লান্তি আর শরীরের ক্লান্তির মধ্যে পার্থক্য বুঝতে না পারার কারণেই পড়তে বসলে আমাদের দ্রুত ঘুম চলে আসে।
ঘুমের রুটিন ঠিক না থাকলে কী হয়?
আমাদের শরীরের একটি নিজস্ব ঘড়ি আছে, যাকে বায়োলজিক্যাল ক্লক বা সার্কেডিয়ান রিদম বলা হয়। আপনার যদি রাতে ঠিকমতো ঘুমানোর অভ্যাস না থাকে, তবে তার সোজা প্রভাব পড়বে আপনার দিনের বেলার কাজ ও পড়াশোনার ওপর। অনেকেই মনে করেন রাতে জেগে পড়লে বেশি পড়া যায়। কিন্তু দিনের পর দিন কম ঘুমানোর ফলে শরীরে যে ক্লান্তি জমা হয়, তা মনোযোগ একেবারে কমিয়ে দেয়। ফলস্বরূপ, যখনই আপনি শান্ত হয়ে পড়তে বসেন, শরীর তার পাওনা ঘুম আদায় করে নিতে চায়।
আরও পড়ুনঃ
শিক্ষার্থীদের পড়া মনে রাখতে বুদ্ধিদীপ্ত পড়াশোনার ১০ পদ্ধতি
পড়ার পরিবেশ কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
আপনার পড়ার জায়গাটি কেমন, তার ওপর আপনার ঘুম আসা না আসা অনেকটাই নির্ভর করে। অনেকেই আরাম করে বিছানায় শুয়ে বা হেলান দিয়ে পড়তে ভালোবাসেন। কিন্তু আমাদের মস্তিষ্ক জানে যে ‘বিছানা’ মানেই ঘুমানোর জায়গা। তাই বিছানায় গেলে অবচেতনভাবেই শরীর রিলাক্স হতে শুরু করে। এর বদলে একটি চেয়ার-টেবিলে বসে পড়ার অভ্যাস করুন। মেরুদণ্ড সোজা থাকলে শরীরে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকে এবং ঘুম কম আসে। এছাড়া যে ঘরে পড়ছেন সেখানে পর্যাপ্ত আলো এবং বাতাসের ব্যবস্থা থাকা খুবই জরুরি। আলো কম থাকলে চোখে চাপ পড়ে এবং দ্রুত ঘুম পায়।
একটানা পড়লে কেন মন বন্ধ হয়ে যায়?
অনেকেই ভাবেন, ৩-৪ ঘণ্টা একটানা না পড়লে হয়তো পড়া ভালো হবে না। কিন্তু দীর্ঘ সময় একটানা পড়ার ক্ষতি অনেক। এতে আমাদের মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতা কমে যায় এবং একঘেয়েমি থেকে ক্লান্তি বা ঘুম চলে আসে। তাই একটানা না পড়ে ছোট ছোট বিরতি নেওয়ার চেষ্টা করুন। যেমন, ২৫ বা ৩০ মিনিট পড়ার পর ৫ মিনিটের একটি ব্রেক নিন (যাকে পোমোডোরো টেকনিক বলা হয়)। এই ব্রেকে একটু উঠে হাঁটাহাঁটি করুন বা চোখে-মুখে ঠাণ্ডা পানির ঝাপটা দিন। এতে ব্রেন আবার নতুন করে কাজ করার এনার্জি পায়।
পানি কম খেলেও ঘুম বাড়তে পারে
আপনি হয়তো জানেন না, শরীরে পানির ঘাটতি বা ডিহাইড্রেশন আমাদের ক্লান্তির অন্যতম বড় একটি কারণ। যখন শরীরে পর্যাপ্ত পানি থাকে না, তখন রক্ত সঞ্চালন ধীর হয়ে যায় এবং অক্সিজেনের সরবরাহ কমে যায়। ফলে খুব সহজেই ক্লান্তি ও ঘুম চলে আসে। তাই পড়ার সময় সব সময় পাশে একটি পানির বোতল রাখুন। মাঝে মাঝে এক-দুই ঢোক পানি পান করলে শরীর সতেজ থাকে এবং ঘুম দূরে পালায়।
খাবারের সাথেও ঘুমের সম্পর্ক আছে
কখনো কি খেয়াল করেছেন দুপুরে পেট ভরে খাওয়ার পর খুব ঘুম পায়? এর কারণ হলো ভারী খাবার খাওয়ার পর তা হজম করার জন্য শরীরের প্রচুর এনার্জি প্রয়োজন হয় এবং রক্তপ্রবাহ পেটের দিকে বেশি চলে যায়, ফলে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ সামান্য কমে যায়। একে ‘ফুড কোমা’ বলা হয়। তাই পড়ার আগে খুব বেশি তেল-মসলাযুক্ত বা ভারী খাবার না খেয়ে হালকা খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন। কী খেলে ঘুম কম আসতে পারে? একটি আপেল, কিছু কাঠবাদাম বা এক কাপ গ্রিন টি আপনার সতেজতা ধরে রাখতে দারুন সাহায্য করবে।
মোবাইল কীভাবে মনোযোগ নষ্ট করে?
“আর মাত্র ৫ মিনিট একটা ভিডিও দেখি, তারপর পড়তে বসব”এই বলে আমরা অনেকেই ফোন হাতে নিই, আর সেই ৫ মিনিট কীভাবে যে ১ ঘণ্টা হয়ে যায়, তা টেরই পাই না! মোবাইলের স্ক্রিন থেকে বের হওয়া ব্লু-লাইট আমাদের চোখের ক্ষতি তো করেই, পাশাপাশি রাতের ঘুমও কেড়ে নেয়। আর রাতে ঘুম না হলে পরের দিন পড়তে বসে ঘুম আসবে, এটাই স্বাভাবিক। তাই পড়তে বসার সময় ফোনটিকে সাইলেন্ট করে অন্য ঘরে বা হাতের নাগালের বাইরে রাখার সহজ কৌশলটি আজই কাজে লাগিয়ে দেখুন।
সকালের পড়া বনাম রাতের পড়া
সবার শরীর একই রকমভাবে কাজ করে না। কারো রাতে পড়তে ভালো লাগে, তো কারো সকালে। তবে বিজ্ঞান বলে, সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর আমাদের মস্তিষ্ক সবচেয়ে ফ্রেশ থাকে। সকালের শান্ত ও স্নিগ্ধ পরিবেশ মনোযোগ দিয়ে পড়ার জন্য সেরা সময়। আপনি যদি রাতে বারবার পড়ার সময় ঘুমিয়ে পড়েন, তবে জোর করে রাত না জেগে একটু আগে ঘুমিয়ে ভোরে ওঠার অভ্যাস করতে পারেন। সবার জন্য রাত জাগা কার্যকর নাও হতে পারে।
মানসিক চাপও ঘুম বাড়ায়
পরীক্ষার ভয় বা ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা থেকে অনেক সময় আমাদের মন ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। দুশ্চিন্তা ও ক্লান্তির মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যখন মানসিক চাপ বেশি থাকে, তখন আমাদের শরীর সেই চাপ থেকে পালাতে চায় এবং ‘এসকেপ মেকানিজম’ হিসেবে ঘুমের আশ্রয় নেয়। তাই পড়ার সময় মন শান্ত রাখার প্রয়োজন। অতিরিক্ত টেনশন হলে গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস (Deep breathing) নিতে পারেন।
শরীর নড়াচড়া করলে কীভাবে ঘুম কমে?
পড়তে পড়তে যখন দেখবেন চোখ বন্ধ হয়ে আসছে, তখন সাথে সাথে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। একটু রুমের এপাশ-ওপাশ হাঁটুন। আড়মোড়া ভাঙুন বা হালকা স্ট্রেচিং করুন। শরীর সক্রিয় রাখলে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে এবং মুহূর্তের মধ্যেই ঘুমের রেশ কেটে যায়।
সবসময় বেশি ঘুম কি স্বাভাবিক?
পড়ার সময় মাঝে মাঝে ঘুম আসা স্বাভাবিক, কিন্তু সারাদিনই যদি আপনার অতিরিক্ত ঘুম পায়, তবে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। অতিরিক্ত ঘুমের সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে থাকতে পারে রক্তস্বল্পতা (অ্যানিমিয়া), থাইরয়েডের সমস্যা, ভিটামিনের অভাব অথবা তীব্র মানসিক অবসাদ বা ডিপ্রেশন। যদি দেখেন শত চেষ্টা করেও আপনি ঘুম নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না, তবে অবশ্যই একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
নিজেকে কঠিনভাবে বিচার না করার গুরুত্ব
একদিন পড়তে বসে খুব ঘুম পেয়ে গেল বলে নিজেকে অযোগ্য বা অলস ভেবে দোষ দেবেন না। আমরা কেউ যন্ত্র নই। একদিন ঘুম এলে বই বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ুন, পরের দিন নতুন উদ্যমে শুরু করুন। ধীরে ধীরে ভালো অভ্যাস তৈরি করাটাই আসল। দীর্ঘসময় না পড়ে, কম সময়েও যদি মনোযোগ দিয়ে পড়া যায়, তবে তার মূল্য অনেক বেশি।
ছোট একটি অভ্যাস যা সাহায্য করতে পারে
পরের বার যখন পড়তে বসে ঘুম আসবে, তখন চোখ বন্ধ করে নিজেকে একটি ছোট প্রশ্ন করুন: “আমি কি সত্যিই ক্লান্ত, নাকি শুধু এই পড়াটাতে আমার মন বসছে না?” যদি উত্তর হয় আপনি সত্যিই ক্লান্ত, তবে একটু বিশ্রাম নিন। আর যদি উত্তর হয় মন বসছে না, তবে পড়ার টপিকটা বদলে ফেলুন অথবা একটু হেঁটে এসে আবার শুরু করুন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
প্রশ্ন: অতিরিক্ত ঘুম দূর করার উপায় কী?
উত্তর: অতিরিক্ত ঘুম দূর করতে হলে সবার আগে রাতে ৭-৮ ঘণ্টা নিয়মিত ঘুমানোর রুটিন তৈরি করতে হবে। প্রতিদিন হালকা ব্যায়াম করা এবং সঠিক ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। এর পাশাপাশি শরীরে যাতে পানির ঘাটতি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
প্রশ্ন: পড়াশোনার সময় ঘুম দূর করার উপায়?
উত্তর: পড়ার সময় ঘুম দূর করতে বিছানা ছেড়ে চেয়ার-টেবিলে বসুন। একটানা না পড়ে ২৫-৩০ মিনিট পর পর ছোট বিরতি নিন। পড়ার টেবিলে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা রাখুন এবং ঘুম পেলে উঠে গিয়ে চোখে-মুখে ঠাণ্ডা পানির ঝাপটা দিন।
প্রশ্ন: পড়তে বসলে ঘুম আসে কেন?
উত্তর: পড়তে বসলে মস্তিষ্ককে বেশি কাজ করতে হয়, ফলে দ্রুত ক্লান্তি আসে। এছাড়া রাতে কম ঘুম হওয়া, একঘেয়েমি, মানসিক চাপ এবং আরামদায়ক জায়গায় (যেমন- বিছানা) পড়ার কারণে পড়তে বসলেই ঘুম আসে।
প্রশ্ন: কি খেলে ঘুম কম আসবে?
উত্তর: ভারী ও কার্বোহাইড্রেট যুক্ত খাবার খেলে ঘুম বেশি পায়। ঘুম এড়াতে হালকা খাবার, ফাইবার যুক্ত ফলমূল (যেমন- আপেল, কলা), বাদাম এবং ডার্ক চকলেট খেতে পারেন। এছাড়া পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি বা এক কাপ চিনি ছাড়া কফি/গ্রিন টি পান করলে সতেজ থাকা যায়।
প্রশ্ন: ঘুমের দুশ্চিন্তা দূর করার উপায়?
উত্তর: ঘুমের দুশ্চিন্তা দূর করতে প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো এবং ওঠার রুটিন তৈরি করুন। ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে সব ধরনের ডিজিটাল স্ক্রিন (মোবাইল, ল্যাপটপ) থেকে দূরে থাকুন। মানসিক শান্তির জন্য বই পড়া বা মেডিটেশন করার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন।
প্রশ্ন: অতিরিক্ত ঘুম কি কোন কোন রোগের লক্ষণ হতে পারে?
উত্তর: হ্যাঁ, সবসময় অস্বাভাবিক মাত্রায় ঘুম আসা বেশ কিছু শারীরিক ও মানসিক সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রক্তস্বল্পতা (Anemia), থাইরয়েডের সমস্যা, ভিটামিন ডি বা বি১২ এর অভাব, স্লিপ অ্যাপনিয়া (Sleep Apnea) এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা ডিপ্রেশন।
শেষ কথা
পরিশেষে একটা কথা মনে রাখবেন, শরীর আর মস্তিষ্ক দুটোই মানুষের অবিচ্ছেদ্য অংশ, এগুলো কোনো মেশিন নয়। জোর করে এদের দিয়ে সবসময় কাজ করানো যায় না। ভালোভাবে পড়ার জন্য যেমন মনোযোগ দরকার, তেমনি শরীর সুস্থ রাখতে পর্যাপ্ত বিশ্রামেরও প্রয়োজন। পড়ার সময় ঘুম আসলে করণীয় বিষয়গুলো এবং ছোট ছোট কৌশলগুলো আপনার দৈনন্দিন রুটিনে যোগ করুন। নিজের প্রতি সদয় হোন, ধীরে ধীরে পড়ার স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুলুন। দেখবেন, পড়ার সময় ঘুম আর আপনার সফলতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। আপনার পড়াশোনার জন্য অনেক শুভকামনা!
.webp)
আজকের আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url