কীভাবে দ্রুত নেটওয়ার্কিং গড়ে তুলবেন ও সম্পর্ক বাড়াবেন
ঢাকার একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দুজন মানুষ একই দিনে চাকরির আবেদন করেছিল।
প্রথমজনের বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলাফল ছিল চমৎকার। দ্বিতীয়জনের ফলাফল ছিল মোটামুটি।
চাকরি পেল দ্বিতীয়জন।
কারণ? সে সেই প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মীকে চিনত। তিনি ভেতর থেকে একটু সুপারিশ করেছিলেন।
এটা অন্যায় নয়। এটা বাস্তবতা।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, ৮৫% চাকরি পাওয়া যায় সম্পর্কের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেখে নয়।
তাহলে প্রশ্ন হলো তুমি কি সেই সম্পর্কগুলো তৈরি করছো? নাকি শুধু যোগ্যতার পেছনে ছুটছো?
নেটওয়ার্কিং মানে কী আর কী নয়
অনেকের মাথায় নেটওয়ার্কিং শুনলে একটা ছবি আসে বিশাল হলঘরে স্যুট পরা মানুষ, হাতে কার্ড বিলি করছে, কৃত্রিম হাসি দিচ্ছে।
এটা নেটওয়ার্কিং নয়। এটা অভিনয়।
সত্যিকারের সম্পর্ক তৈরি হয় অন্যভাবে।
বিখ্যাত লেখক কেইথ ফেরাজি তাঁর গবেষণায় বলেছেন "সেরা নেটওয়ার্কাররা কখনো নেটওয়ার্কিং করতে যায় না। তারা মানুষকে সাহায্য করতে যায়।"
এই একটা কথাই পুরো বিষয়টার মূল।
সম্পর্ক তৈরি হয় দেওয়া থেকে নেওয়া থেকে নয়।
আরও পড়ুনঃ আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর উপায়: সফল জীবনের জন্য প্রমাণিত কৌশল ও অভ্যাস
সম্পর্ক বাড়ানোর কার্যকর উপায়গুলো
১. আগে দাও পরে চাও
বেশিরভাগ মানুষ সম্পর্ক তৈরি করতে যায় যখন তার কিছু দরকার হয়। চাকরি দরকার, তখন যোগাযোগ করে। সুপারিশ দরকার, তখন ফোন করে।
এটা কাজ করে না।
কারণ মানুষ বুঝতে পারে তুমি তার কাছে আসছো কারণ তোমার কিছু দরকার, তাকে ভালোবাসো বলে নয়।
সঠিক পদ্ধতি হলো কিছু দরকার হওয়ার অনেক আগেই সম্পর্ক তৈরি করো।
কাউকে একটা কাজের তথ্য পাঠাও। কারো লেখা পড়ে মন্তব্য করো। কাউকে তার পরিচিত কারো সাথে পরিচয় করিয়ে দাও। ছোট ছোট উপকার কিন্তু এগুলোই সম্পর্কের ভিত্তি।
২. মনোযোগ দিয়ে শোনো এটাই সবচেয়ে বড় উপহার
একটা পরীক্ষা করো। পরের বার কারো সাথে কথা বলার সময় ফোন পকেটে রাখো, চোখে চোখ রাখো, এবং শুধু শোনো।
কথার মাঝে নিজের গল্প ঢোকানোর চেষ্টা করো না। পরামর্শ দেওয়ার তাড়া করো না। শুধু শোনো এবং প্রশ্ন করো।
মনোবিজ্ঞানী কার্ল রজার্স বলেছেন "সত্যিকারের মনোযোগ পাওয়া মানুষের সবচেয়ে বিরল এবং সবচেয়ে মূল্যবান অভিজ্ঞতাগুলোর একটি।"
তুমি যদি কাউকে সত্যিকারের মনোযোগ দাও সে তোমাকে মনে রাখবে।
৩. নাম মনে রাখো এবং ব্যবহার করো
ডেল কার্নেগি তাঁর বিখ্যাত বইতে লিখেছেন "একজন মানুষের কাছে তার নিজের নামই সবচেয়ে মধুর শব্দ।"
কারো সাথে পরিচয় হলে তার নাম মনে রাখো। পরের বার দেখা হলে নাম ধরে ডাকো।
এই ছোট কাজটা অবিশ্বাস্য প্রভাব ফেলে।
নাম মনে রাখার একটা সহজ কৌশল পরিচয়ের পরপরই মনে মনে তিনবার তার নাম বলো। এবং কথোপকথনে দুই-তিনবার তার নাম ব্যবহার করো।
৪. আগ্রহ দেখাও কিন্তু সত্যিকারের
মানুষ কৃত্রিম আগ্রহ সহজেই বুঝতে পারে।
তাই কারো সম্পর্কে সত্যিকারের একটা বিষয় খুঁজে বের করো যা তোমার কাছে আকর্ষণীয় লাগে তার কাজ, তার অভিজ্ঞতা, তার দৃষ্টিভঙ্গি।
সেই বিষয়ে প্রশ্ন করো। গভীরে যাও।
মানুষ নিজের সম্পর্কে কথা বলতে পছন্দ করে। তুমি যদি সেই সুযোগ দাও সে তোমার সাথে কথা বলে আনন্দ পাবে।
৫. যোগাযোগ রক্ষা করো হারিয়ে যেও না
একটা সম্পর্ক তৈরি হওয়ার পরেই বেশিরভাগ মানুষ ভুলে যায়।
মাস তিনেক পরে হঠাৎ একটা বার্তা "ভাই, একটু সাহায্য করবেন?"
এটা সম্পর্ক নয়। এটা লেনদেন।
সত্যিকারের সম্পর্ক রক্ষা করতে হয় নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে।
- কারো জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাও কিন্তু শুধু "শুভ জন্মদিন" নয়, একটু ব্যক্তিগত কথা লেখো
- কারো সাফল্যে অভিনন্দন জানাও
- কোনো প্রয়োজনীয় তথ্য বা লেখা পেলে পাঠাও "এটা দেখে তোমার কথা মনে পড়লো"
- মাঝে মাঝে শুধু জিজ্ঞেস করো "কেমন আছো?"
এই ছোট ছোট যোগাযোগগুলোই সম্পর্ককে জীবন্ত রাখে।
৬. বিভিন্ন ধরনের মানুষের সাথে মিশো
আমরা স্বাভাবিকভাবেই নিজের মতো মানুষদের সাথে মিশতে পছন্দ করি। একই পেশা, একই বয়স, একই চিন্তাভাবনা।
কিন্তু এটাই সীমাবদ্ধতা তৈরি করে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মার্ক গ্রানোভেটারের গবেষণায় দেখা গেছে জীবনে বড় সুযোগ আসে বেশিরভাগ সময় পরিচিতের পরিচিতের কাছ থেকে। একদম কাছের বন্ধুদের কাছ থেকে নয়।
কারণ কাছের বন্ধুরা তোমার মতোই একই বৃত্তে থাকে। দূরের পরিচিতরা থাকে ভিন্ন বৃত্তে যেখানে নতুন সুযোগ আছে।
তাই ভিন্ন পেশার, ভিন্ন বয়সের, ভিন্ন অভিজ্ঞতার মানুষদের সাথে পরিচয় বাড়াও।
৭. সামাজিক মাধ্যমকে সঠিকভাবে ব্যবহার করো
সামাজিক মাধ্যম সম্পর্ক তৈরির অসাধারণ একটি হাতিয়ার কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ এটাকে শুধু নিজেকে দেখানোর জায়গা হিসেবে ব্যবহার করে।
অন্যদের লেখায় অর্থবহ মন্তব্য করো শুধু "সুন্দর" বা "চমৎকার" নয়।
কারো কাজের প্রশংসা করতে চাইলে সরাসরি বার্তা পাঠাও। বেশিরভাগ মানুষই এটা প্রত্যাশা করে না তাই এটা গভীর প্রভাব ফেলে।
নিজেও কিছু লেখো। নিজের চিন্তা, অভিজ্ঞতা ভাগ করো। এতে একই ধরনের চিন্তার মানুষরা তোমার কাছে আসবে।
যে ভুলগুলো সম্পর্ক নষ্ট করে
শুধু নিজের কথা বলা। কথোপকথনে যদি তুমিই বেশি কথা বলো সেটা সম্পর্ক নয়, একক অভিনয়।
প্রতিশ্রুতি ভাঙা। "পরে জানাবো" বলে না জানানো, "অবশ্যই সাহায্য করবো" বলে ভুলে যাওয়া এগুলো বিশ্বাস ভাঙে। আর বিশ্বাস একবার ভাঙলে গড়তে অনেক সময় লাগে।
কেবল প্রয়োজনের সময় যোগাযোগ করা। এটা সবাই বোঝে। এবং কেউ ভালো লাগে না।
সম্পর্ককে একতরফা রাখা। শুধু তুমিই যোগাযোগ করছো, ওপাশ থেকে সাড়া আসছে না তাহলে জোর করে এগিয়ে যাওয়ার দরকার নেই। সব সম্পর্ক হয় না, হওয়ার কথাও নয়।
আরও পড়ুনঃভালো শ্রোতা হওয়ার কৌশল:আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর সম্পূর্ণ গাইড
চাকরিজীবীদের জন্য বিশেষ কিছু কথা
কর্মক্ষেত্রে সম্পর্ক তৈরি করা আলাদা একটা দক্ষতা।
শুধু নিজের কাজ ভালো করলেই হয় না। যারা সিদ্ধান্ত নেন তারা তোমাকে চেনেন কিনা, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
কিছু কার্যকর উপায়:
- দলের বাইরের মানুষদের সাথেও পরিচয় রাখো ভিন্ন বিভাগের সহকর্মী, ভিন্ন শাখার মানুষ
- কারো কাজের প্রশংসা সরাসরি করো ইমেলে বা সামনাসামনি
- দলের সমস্যায় সমাধান নিয়ে আসো শুধু সমস্যা নিয়ে নয়
- নতুন কেউ যোগ দিলে নিজে থেকে পরিচিত হও তাকে স্বাগত জানাও
- কারো সাফল্য দেখলে ঊর্ধ্বতনদের সামনে তার কথা বলো
শেষেরটা খুব কম মানুষ করে। কিন্তু এটা সবচেয়ে শক্তিশালী।
ছাত্রজীবনে সম্পর্ক তৈরির সঠিক সময়
অনেকে মনে করে সম্পর্ক তৈরির বিষয়টা চাকরিতে ঢোকার পরের ব্যাপার।
এটা ভুল।
ছাত্রজীবনেই সেরা সময় সম্পর্ক তৈরির। কারণ এই সময়ে মানুষ বেশি উন্মুক্ত থাকে, নতুন পরিচয় হতে চায়।
- বিভিন্ন দলে, সংগঠনে যোগ দাও
- শিক্ষকদের সাথে সম্পর্ক রাখো তারা পরে সুপারিশ লেখেন, পথ দেখান
- সিনিয়রদের সাথে যোগাযোগ রাখো তারা তোমার আগে যেখানে যেতে চাও, সেখানে আছে
- বিভিন্ন বিষয়ের অনুষ্ঠানে যাও শুধু নিজের বিষয়ের নয়
আজকের সহপাঠী কাল হয়তো তোমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ হবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন ১: আমি খুব লাজুক নতুন মানুষের সাথে কথা শুরু করতে পারি না। কী করবো?
লাজুকতা কোনো দোষ নয়, এটা একটা স্বভাব। তবে এটা বদলানো সম্ভব। শুরু করো ছোট থেকে লিফটে পাশে দাঁড়ানো মানুষকে একটা হাসি দাও। দোকানে বিক্রেতার সাথে একটা বাড়তি কথা বলো। এই ছোট অভ্যাসগুলো ধীরে ধীরে লাজুকতা কমায়। আর মনে রেখো বেশিরভাগ মানুষই চায় কেউ আগে কথা বলুক।
প্রশ্ন ২: অনেক পরিচিত আছে, কিন্তু সত্যিকারের সম্পর্ক নেই এই সমস্যা কীভাবে সমাধান করবো?
পরিমাণের চেয়ে গুণমান বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পাঁচশো পরিচিতের চেয়ে দশজন গভীর সম্পর্ক অনেক বেশি মূল্যবান। বর্তমান পরিচিতদের মধ্যে থেকে কয়েকজনকে বেছে নাও তাদের সাথে সময় কাটাও, গভীরে যাও। সব সম্পর্ককে একসাথে গভীর করা সম্ভব নয়।
প্রশ্ন ৩: কাউকে সাহায্য চাইতে কেমন যেন লজ্জা লাগে এটা কি স্বাভাবিক?
সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। কিন্তু জেনে রাখো গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ সাহায্য করতে পছন্দ করে। সাহায্য করতে পারলে মানুষ ভালো অনুভব করে। তাই সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয় এটা সম্পর্ককে আরো গভীর করার একটা উপায়।
প্রশ্ন ৪: কর্মক্ষেত্রে কীভাবে বুঝবো কার সাথে সম্পর্ক রাখা উচিত?
শুধু ঊর্ধ্বতনদের সাথে সম্পর্ক রাখার ভুল করো না। সমপর্যায়ের এবং নিচের পর্যায়ের সবার সাথে ভালো সম্পর্ক রাখো। সংগঠন সব দিক থেকে কাজ করে। আজকে যে ছোট পদে আছে, কাল সে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
প্রশ্ন ৫: সামাজিক মাধ্যমে কতটুকু সক্রিয় থাকা উচিত?
প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা নয়। সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার অর্থবহ কিছু পোস্ট করো বা মন্তব্য করো। গুণমান গুরুত্বপূর্ণ, পরিমাণ নয়। একটা ভালো মন্তব্য একশোটা "চমৎকার!" এর চেয়ে বেশি কাজ করে।
আপনাদের পছন্দ হবে এমন কিছু আর্টিকেল এর তালিকাঃ
শেষ কথা
সেই গল্পের দ্বিতীয় মানুষটার কথা মনে আছে যে মোটামুটি ফলাফল নিয়েও চাকরি পেয়েছিল?
সে হয়তো জন্ম থেকে মিশুক ছিল না। হয়তো সেও কোনো একদিন একটু সাহস করে একজনের সাথে কথা বলেছিল। সেই একটা কথা থেকে একটা সম্পর্ক। সেই সম্পর্ক থেকে একটা সুযোগ।
সম্পর্ক তৈরি হয় একটা ছোট পদক্ষেপ থেকে।
আজকে তুমি একটা কাজ করো এমন একজনকে একটা বার্তা পাঠাও যার সাথে অনেকদিন যোগাযোগ হয়নি। শুধু জিজ্ঞেস করো, "কেমন আছো?"
এটুকুই শুরু।
বাকিটা এমনিই হয়ে যায়।
এই লেখাটা কি তোমার কাজে লেগেছে? তোমার বন্ধু বা সহকর্মীদের সাথে শেয়ার করো। আর তুমি সম্পর্ক তৈরিতে সবচেয়ে বড় যে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছো নিচে মন্তব্যে জানাও!
.webp)

আজকের আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url